কুলিয়ারচরে উছমানপুর ইউপি চেয়ারম্যান নিজাম ক্বারীর বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ
মোঃ আলী সোহেল, কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি :
সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ সহ ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে কিশোরগঞ্জ জেলার কুলিয়ারচর উপজেলার উছমানপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. নিজাম ক্বারীর বিরুদ্ধে।
এ বিষয়ে উছমানপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য মো. লিয়াকত আলী গিরানি গত ২ অক্টোবর কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসক বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য অনুলিপি প্রেরণ করেন চেয়ারম্যান, দূর্নীতি দমন কমিশন, সেগুনবাগিচা, ঢাকা ও সচিব, স্থানীয় সরকার বিভাগ, স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সচিবালয়, ঢাকা বরাবর।
আবেদন লিপিতে মো. লিয়াকত আলী গিরানি উল্লেখ করেছেন, ২০২১-২০২২ অর্থ বছরে ধার্যকৃত ট্যাক্সের টাকা হতে ৪ থেকে ৫ গুণ টাকা আদায় করলেও আদায়কৃত টাকা ইউনিয়ন পরিষদের রাজস্ব তহবিলে জমা না দিয়ে এসব টাকা আত্মসাৎ করছেন ইউপি চেয়ারম্যান নিজাম ক্বারী। শুধু তাই নয় ইউনিয়ন পরিষদে জন্ম নিবন্ধ ও নাগরিকত্ব সনদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে সাধারন জনগন।
তিনি আবেদনে আরো উল্লেখ করেন ২০২১-২০২২ অর্থ বছরে উছমানপুর ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডে কর ধার্য করেন ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৪ শত টাকা। এর মধ্যে ৪ নং ওয়ার্ডে ২০২১-২০২২ অর্থ বছরে ট্যাক্স ধার্য করা হয়েছে ৪৩ হাজার ৬০ টাকা। ওই ওয়ার্ডে মোট হোল্ডিং সংখ্যা ৩২৯ টি। এদের মধ্যে ১৬৩ হোল্ডিং থেকে রশিদের মাধ্যমে মোট ট্যাক্স আদায় করেছে ৮৯ হাজার ৮ শত ১০ টাকা। বাকী ১৬৮টি হোল্ডিং এর হিসাব পাওয়া যায়নি। ৪নং ওয়ার্ডের ট্যাক্স আদায় অনুযায়ী ৯টি ওয়ার্ড থেকে এ অর্থ বছরে চেয়ারম্যান ও তার অনুসারীরা পাঁচ গুণেরও বেশী অর্থাৎ ১৮-২০ লাখ টাকা ট্যাক্স আদায় করেলেও এসব টাকা আদায়ের কোন প্রমাণ ইউনিয়ন পরিষদে রাখেননি। ওই চেয়ারম্যান আদায়কৃত টাকা ইউনিয়ন পরিষদের রাজস্ব তহবিলে জমা না দিয়ে নিজ ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে অনিয়ম ও দুর্নীতি করে আত্মসাৎ করে যাচ্ছেন বলে দাবী করেন তিনি।
আবেদনে আরো উল্লেখ করেছেন, ওই ইউনিয়নে অসহায় বয়স্ক ভাতা ভোগী ২৮৭ জন ও বিধবা ভাতা ভোগী ১১৭ জন। মোট ৪০৪ জন ভাতা ভোগীর কাছ থেকে ভাতা ট্যাক্স এর নাম করে সর্বনিম্ন ৪০০ এবং সর্বোচ্চ ৬০০ টাকা করে আদায় করে নিয়েছেন চেয়ারম্যান। অসহায় বয়স্ক ও বিধবা ভাতা ভোগীরা বাড়ির হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধ করার রশিদ প্রদর্শন করলেও ওই চেয়ারম্যান বলেন, এটা ভাতার ট্যাক্স পরিশোধ করতেই হবে, না করলে আপনি ভাতার টাকা পাবেন না। আপনার ফিঙ্গার প্রিন্ট নেওয়া হবে না। চেয়ারম্যান কুলিয়ারচর পৌর এলাকার গাইলকাটা মহল্লায় তার ব্যক্তিগত কার্যালয়ে ভাতা ভোগীদের ডেকে নিয়ে ব্যাংক এশিয়া’র মাধ্যমে ফিঙ্গার প্রিন্ট নেয় এবং রশিদের মাধ্যমে ভাতা ভোগীদের নিকট থেকে ভাতা ট্যাক্সের নামে ৪০০-৬০০ টাকা করে আদায় করেন যাহা ব্যাংক এশিয়া’র কুলিয়ারচর অফিসের দ্বায়িত্বরত কর্মকর্তা আল আমিন অবগত আছেন বলে দাবী করেন তিনি। এব্যাপারে কিছু লোক প্রতিবাদ করলে চেয়ারম্যান ও তার পিএস নজরুল মোল্লা সাধারণ ভাতা ভোগীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন। বাড়ির ট্যাক্স দেওয়ার পর বয়স্ক ভাতা ও বিধবা ভাতা ট্যাক্স নামে যাদের কাছ থেকে রশিদের মাধ্যমে টাকা আদায় করে নিয়েছে এমন ১৫-২০ টি রশিদ নম্বর আবেদনে উল্লেখ করেন তিনি।
এ্যাসেসমেন্ট খাতায় উল্লেখ রয়েছে প্রতি হোল্ডিং এর জন্য বাৎসরিক ট্যাক্সের পরিমান ৫০, ৭০, ১২০, ১৩০, ১৪০ ও ১৫০ টাকা।কিন্তু ওই চেয়ারম্যান প্রতি হোল্ডিং থেকে রশিদের মাধ্যমে ১২০, ২০০, ৩০০, ৩৯০, ৪০০, ৫০০, ৬০০, ৭০০, ৮০০, ১০০০, ১৫০০ ও ২০০০ টাকা করে আদায় করে নিয়েছেন। যাহা কোন রেজিস্টারে উল্লেখ নেই। রশিদের অবশিষ্ঠ অংশও সংরক্ষণে রাখেননি।এমনকি ইউনিয়ন পরিষদের রাজস্ব তহবিলেও টাকা জমা করেননি তিনি। ওই ইউনিয়ন থেকে ১৬৩ টি রশিদ সংগ্রহ করে দেখা যায় ২০২১-২০২২ অর্থ বছরে ৮৯ হাজার ৮ শত ১০ টাকা রশিদের মাধ্যমে আদায় করেছে চেয়ারম্যান। বাকী রশিদ সংগ্রহ করতে না পারলেও ধারণা করা হচ্ছে ৯টি ওয়ার্ডে সব মিলিয়ে প্রায় ২০ লক্ষ টাকা আদায় করে কিছু টাকা রাজস্ব তহবিলে জমা দিয়ে বাকী টাকা আত্মসাৎ করেছেন তিনি।
লিয়াকত আলী গিরানি আবেদন লিপিতে আরো উল্লেখ করেন, জন্ম নিবন্ধ সনদ, ওয়ারিশান সনদ ও নাগরিকত্ব সনদ সংগ্রহ করতে গেলে ট্যাক্স এর নামে ৪/৫ গুণ বেশী টাকা আদায় করে নেওয়া হয়। ৩/৪ জন বহিরাগত লোক সব সময় ইউনিয়ন পরিষদে অবস্থান করেন। এদের মধ্যে নজরুল মোল্লা অন্যতম। জনপ্রতিনিধি ও সরকারি চাকুরিজীবি ছাড়া বহিরাগত কেউ যাতে ইউনিয়ন পরিষদে সবসময় বসে থাকতে না পারে সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের দাবী জানান তিনি।
এব্যাপারে অভিযুক্ত উছমানপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. নিজাম ক্বারীর সাথে ফোন কলে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। রাজস্ব যত টাকা আয় হয় তা নিয়মিত ইউনিয়ন রাজস্ব খাতে জমা হচ্ছে। জন্ম নিবন্ধনে হয়রানি বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, জন্ম নিবন্ধন তো আমি করি না সেখানে দায়িত্ব প্রাপ্ত লোক আছে। তিনি আরও বলেন, নিজের পকেট থেকে প্রতি মাসে বিশ হাজার টাকা খরচ করি, জনগণ যাতে সঠিক ভাবে সেবা পায়।
এব্যাপারে কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শামীম আলম এর সাথে যোগাযোগ করা হলে এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পাওয়ার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।