জেলে বসে পরিকল্পনা, বের হয়ে হত্যা- প্রধান চার আসামীকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব-১

1559

গাজীপুর প্রতিনিধিঃ  গাজীপুরের ন্যাশনাল পার্ক এলাকার ক্লুলেস চাঞ্চল্যকর মোঃ সাগর(১৮) হত্যা মামলার প্রধান চার আসামীকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব-১।

গত ১৬ অক্টোবর ২০২০ তারিখ সন্ধ্যা অনুমান ০৬.৩০ ঘটিকার সময় ভিকটিম মোঃ সাগর মিয়া(১৮), পিতা-মৃত ইদ্রিস আলী, সাং-চরনীখলা, থানা-ইশ্বরগঞ্জ, জেলা-ময়মনসিংহ, এ/পি-সাং-বাহাদুরপুর (বিল্লাল হোসেন এর বাড়ির ভাড়াটিয়া), থানা-সদর, জিএমপি, গাজীপুর নিখোঁজ হয়। নিখোঁজ হওয়ার পর ভিকটিমের পরিবার খোঁজাখুজির একপর্যায়ে এই সংক্রান্তে গাজীপুর মহানগরীর সদর থানায় একটি নিখোঁজ সংক্রান্তে সাধারণ ডায়েরী করেন, যা নম্বর-১৭০১ তারিখ ২৯/১০/২০২০ খ্রিঃ। পরবর্তীতে গত ০৩ নভেম্বর ২০২০ ইং তারিখ ভিকটিমের পরিবার র‌্যাব-১, স্পেশালাইজড কোম্পানী, গাজীপুর ক্যাম্পে এসে নিখোঁজ ভিকটিমকে উদ্ধারের জন্য আইনগত সাহায্য কামনা করে। অভিযোগ প্রাপ্ত হওয়ার পর নিখোঁজ ভিকটিম মোঃ সাগর মিয়া(১৮)কে উদ্ধারের লক্ষ্যে র‌্যাব-১, স্পেশালাইজড কোম্পানীর চৌকস তদন্ত দল ছায়া তদন্ত শুরু করে এবং র‌্যাবের সোর্স নিয়োগসহ সকল ধরনের গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসিতেছিল। নিখোঁজ ভিকটিম সাগর আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সোর্স হিসেবেও কাজ করত।

ভিকটিম সাগর নিখোঁজের পর গত ১৯ অক্টোবর ২০২০ তারিখ অনুমানিক ১৪.০০ ঘটিকার সময় গাজীপুর মহানগরীর ন্যাশনাল পার্কের নান্দুয়াইন চাতুরাপাড়া সাকিনস্থ নাফিজ গার্ডেনের পশ্চিম পাশের দেওয়াল সংলগ্ন খায়রুল মিয়ার ধান ক্ষেতের ভিতর হতে একটি অজ্ঞাত যুবকের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে র‌্যাব এবং পুলিশ। লাশ উদ্ধারের পর পুলিশ বাদী হয়ে গাজীপুর মেট্টোঃ সদর থানায় অজ্ঞাতনাম আসামী করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন, যার মামলা নং-২৮, তারিখ ১৯-১০-২০ ধারা-৩০২/২০১/৩৪ পেনাল কোড। পরবর্তীতে গত ০৫/১১/২০২০ তারিখ নিখোঁজ ভিকটিম সাগর এর পরিবারের লোকজন র‌্যাব ক্যাম্পে এসে উদ্ধারকৃত লাশের গায়ের পোষাক, বেল্ট, পায়ের স্যান্ডেলের ছবি দেখে এটা নিখোঁজ সাগরের লাশ বলে সনাক্ত করে। উক্ত হত্যাকান্ডের ঘটনাটি সারাদেশে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে এবং বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে গুরুত্বের সাথে প্রচারিত হয়। উদ্ধারকৃত লাশটি নিখোঁজ ভিকটিম সাগর(১৮) এর বলে সনাক্ত হওয়ার পর র‌্যাব-১ এর চৌকস আভিযানিক দল এই নির্মম হত্যাকারীদের গ্রেফতার করে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে ছায়া তদন্ত শুরু করে ও সকল ধরনের গোয়েন্দা নজরদারী বৃদ্ধি করে।
এই ক্লুলেস হত্যাকান্ডের মোটিভ উদ্ঘাটনে ও বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষন করে অদ্য ০৬ নভেম্বর ২০২০ইং তারিখ রাত আনুমানিক ০১.৩০ ঘটিকায় র‌্যাব-১ এর আভিযানিক দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গাজীপুর মহানগরীর সদর থানার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে উপরোক্ত হত্যা মামলার প্রধান আসামী ১। মোঃ লিটন(২৩), পিতা-মোঃ আবুল হাসেম, মাতা-মোসাঃ লায়লী বেগম, সাং-বাহাদুরপুর, ২। মোঃ শাহীন(২২), পিতা-মোঃ জহিরুল ইসলাম, মাতা-মোসাঃ সাজেদা খাতুন, সাং-ভাওরাইদ দক্ষিণপাড়া, ৩। মোঃ শরীফুল ইসলাম(৩৮), পিতা-মোঃ আব্দুল আলী, মাতা-মোসাঃ রহিমা খাতুন, সাং-বাহাদুরপুর, ৪। মোঃ আরমান(১৯), পিতা-মোঃ আমিরুল, মাতা-সমেলা খাতুন, সাং-বাহাদুরপুর, সর্ব থানা-সদর, জিএমপি, গাজীপুর’দেরকে গ্রেফতার করে।

ধৃত আসামীদের ভাষ্যমতে, ধৃত আসামীরা পেশায় এলাকার চিহিৃত মাদক ব্যবসায়ী/সন্ত্রাসী। উক্ত আসামীদেরকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পূর্বে বিভিন্ন মামলায় আটক করেছিল, আটক অবস্থায় তারা জেলখানায় থাকাকালীন আলোচনা করে তাদের আটকের পিছনে সোর্স সাগরের ভূমিকা রয়েছে। জেলে বসে তারা পরিকল্পনা করে জেল থেকে বের হয়ে তাদের পথের কাঁটা সাগরকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিবে। এই হত্যাকান্ডে জড়িত আসামীরা একটি সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ী চক্র। তাদের চলার পথ মসৃন করার লক্ষ্যে অন্ত্যন্ত সু-পরিকল্পিত ও ঠান্ডা মাথায় এই হত্যাকান্ড সংগঠিত করে এবং উক্ত হত্যাকান্ডের পূর্বেও একাধিক বার আসামী আরমান প্রকাশ্যে ভিকটিম সাগরকে হত্যার হুমকিসহ তার বাসায় গিয়ে মারধর করে আসে। ঘটনার আনুমানিক এক মাস আগে তারা জেল থেকে জামিনে মুক্তি পায় এবং সোর্স সাগরের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তুলে যেন সাগর বুঝতে না পারে। ঘটনার দিন সন্ধ্যায় ধৃত আসামীদের পূর্ব পরিকল্পনা মতে গাজীপুর মহানগরীর ভীমবাজার এলাকায় ভিকটিম সাগর সহ তারা একসাথে চোলাইমদ পান করে। ধৃত আসামী মোঃ শরীফুল এবং পলাতক আসামী আমিরুল এর পরিকল্পনা মতে, ঐ দিন সন্ধ্যা আনুমানিক ১৯.১৫ ঘটিকার দিকে আসামীরা ভিকটিম সাগরকে ইয়াবা দেওয়ার কথা বলে সন্ত্রাসী লিটন এবং শাহীন এর সাথে থাকা মটর সাইকেলে করে ভিকটিম সাগরকে নিয়ে ন্যাশনাল পার্কের গহীন বনের মধ্যে নিয়ে যায়। ধৃত আসামী শরীফুল ও আরমান দুইজনে রাস্তায় পাহারার দায়িত্বে থাকে এবং পলাতক আসামী আমিরুল পূর্ব থেকেই বনের মধ্যে ঘটনাস্থলে চাকু এবং লাঠি নিয়ে অবস্থান করেছিল। সন্ত্রাসী লিটন এবং শাহীন ভিকটিম সাগরকে নিয়ে বনের ভিতর পৌছালে তারা তিনজনে মিলে প্রথমে ভিকটিম সাগরকে লাঠি দিয়ে মারতে শুরু করে এবং পলাতক আসামী আমিরুলের সাথে থাকা গামছা দিয়ে সাগরের গলা গাছের সাথে বেঁধে ফেলে, শাহীন দুই পা, লিটন দুই হাত চেপে ধরে এবং আমিরুল তার সাথে থাকা ধারালো চাকু দিয়ে ভিকটিম সাগরের গলা জবাইসহ তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাথারী ছুরিকাঘাত করে। ভিকটিম সাগরের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পরে হত্যাকারীরা লাশ কাঁধে নিয়ে ঘটনাস্থল হতে অনুমান ২০০ মিটার দূরে গাজীপুর মহানগরীর ন্যাশনাল পার্কের নান্দুয়াইন চাতুরাপাড়া সাকিনস্থ নাফিজ গার্ডেনের পশ্চিম পাশের দেওয়াল সংলগ্ন খায়রুল মিয়ার ধান ক্ষেতের ভিতর নিয়ে লাশকে অজ্ঞাত করার উদ্দেশ্যে লাশের মুখে এসিড দিয়ে পুড়িয়ে ফেলে রেখে দ্রুত পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে হত্যাকারীরা রক্তাক্ত শরীর পরিস্কার করে মটর সাইকেলে করে পলাতক আসামী আমিরুলের বাসায় দাওয়াত খেয়ে রাতে যার যার বাসায় চলে যায় এবং আটক হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত স্বাভাবিক জীবনযাপন করছিল।
গ্রেফতারকৃত আসামীদের থানার হস্তান্তর করা হয়েছে।